ব্রডব্যান্ডের পর শৃঙ্খলায় আসছে মোবাইল ইন্টারনেট

১৩ আগষ্ট, ২০২১ ১০:৩৪  
একযুগ পর শৃঙ্খলায় আসতে যাচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশের ব্যাকবোন খ্যাত দেশের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট খাত। প্রশমিত হতে যাচ্ছে এই জরুরী সেবা খাতের তিন অংশীজনের মধ্যে বিদ্যমান ‘খুনসুটি’। বডম-আপ অ্যাপ্রোচে আইএসপি, আইআইজি এবং এনটিটিএন পর্যায়ে ‘সর্বোচ্চ সেবামূল্য’ ও ‘সেবার মানদণ্ড’ বেঁধে দেয়ায় প্রান্তিক পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদে পুঞ্জিভূত বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি এবার ‘ভূঁইফোড়’ ও ‘পেশী-শক্তির’ অবসান ঘটবে বলে মনে করছেন প্রযুক্তিবাজার বোদ্ধারা। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) এই উদ্যোগকে ইন্টারনেট সেবার ‘বাঁক বদল’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। প্রাথমিক ভাবে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবায় ‘এক দেশ এক রেট’ বাস্তবায়নের মাইলফলক বলা হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এই উদ্যোগ বহুমুখী সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করলো বলেও মনে করছেন তারা। উদ্যোগটিকে ইন্টারনেট সেবা ব্যবসায় একটি ‘সেতুবন্ধক’ হিসেবেই মূল্যায়ন করা হচ্ছে। কেননা, নির্দেশনা অনুযায়ী চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যেই ৬৪ জেলায় ইন্টারনেট গেটওয়ে পপ স্থাপন করতে হবে দেশের ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এর ফলে আগামী জানুয়ারি মাস থেকেই আইআইজি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে তুলনামূলক সাশ্রয়ে ব্যান্ডউইথ কিনে স্বাচ্ছন্দ্যে ও সহজেই প্রান্তিক মানুষের দ্বারপ্রান্তে ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দিতে পারবে আইএসপি সেবদাতারা। অংশীজনদের কণ্ঠে ইতোমধ্যেই সেই সুরও শোনা গেছে। ইতোমধ্যেই আইআইজিবি মহাসচিব আহমেদ জুনায়েদ দায়িত্ব নিয়েই ঘোষণা করেছেন, চলতি বছরের বিজয় দিবসের আগেই দেশের প্রতিটি জেলায় ইন্টারনেট গেটওয়ে পপ স্থাপন করবেন তারা। প্রতিশ্রুতি দিয়ে আইআইজিবি মহাসচিব বলেছেন, ‘প্যান্ডামিকের কারণে চিপসেট শর্টেজ আছে। হার্ডওয়্যার ইমপোর্টের অনেক জটিলতা আছে। কিন্তু এগুলোর অজুহাত আমরা দেবো না।’ তবে এই প্রতিশ্রুতি পূরণ চ্যালেঞ্জের বলেও উল্লেখ করে আহমেদ জুনায়েদ- ‘বিটিআরসি যে ট্যারিফ দিয়েছে তা নিকটবর্তী জেলাই বলেন আর ৫০০ কিলোমিটার দূরে.. টোটাল সেইম প্রাইসে (ব্যান্ডউইথ) দেয়ার জন্য আমরা প্রস্তাব দিয়েছি এবং সেটা অ্যাপ্রুভ হয়েছে। এখন বলতে পারেন, এতোদিন আমরা যা পারিনি তা কিভাবে পারছি। এখানে এনটিটিএনরা যেমন আমাদের সহযোগিতা করেছে তেমনি কিছু জিনিস আমরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি।’ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর উপহার হিসেবে সবধাপে এই মূল্যসীমা কমানো হয়েছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন-
‘সেপ্টেম্বর থেকে আমরা কেবল এক দেশ এক রেট নয়; আশাকরি কয়েক মাসের মধ্যেই আমরা ‘এক দেশে একরেট এক সার্ভিস’ দিতে পারবো। এখানে এই সার্ভিসটাই কিন্তু ইমপর্টান্ট। রেট এক হলেও ঢাকার মানুষ যে সার্ভিস পাচ্ছে, ঢাকার বাইরে যদি সেই সেবা না পায় তাহলে ওই রেট দিয়ে আমরা কী করবো?’
অপরদিকে এই খাতে শৃঙ্খলা ফিরলে আগামী ২৬ মার্চ থেকে বিটিআরসি ঘোষিত দেশজুড়ে প্রান্তিক গ্রাহক পর্যায়ে ৫০০ টাকায় ৫ এমবিপিএস’র দামে ১০ এমবিপিএস ইন্টারনেট দেয়ার ঘোষণা দেন আইএসপিএবি সভাপতি আমিনুল হাকিম। তবে এজন্য অবৈধ আইএসপিগুলো বন্ধ করার পাশাপাশি লাইসেন্সধারী সকল আইএসপিকে গ্রামে-গঞ্জে সেবা দেয়ার পথে বাধাসৃষ্টিকারী স্থানীয় পেশীশক্তি মোকাবেলায় স্থানীয় প্রশাসনের শক্ত-ভূমিকা দাবি করেন তিনি।
‘বিটিআরসি’র প্রতি একটা অনুরোধ থাকবে, এনটিটিএন, আইআইজি ও আইএসপিদের যে রোলআউট অবলিগেশনগুলো আছে তা যেনো অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়। বিটিআরসি’র মনিটরিংটা যেনো আরো জোরদার করা হয়।’
অপরদিকে সরকারি এনটিটিএনগুলোকে এই ট্যারিফের অন্তর্ভূক্ত করা না হলে সরকার ঘোষিত ‘এক দেশ এক রেট’ বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বেসরকারি এনটিটিএন প্রতিষ্ঠান সামিট কমিউনিকেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আরিফ আল ইসলাম। তিনি বলেছেন, ‘প্রাইভেট এনটিটিএনদের পক্ষ থেকে আমার হাম্বল রিক্যুয়েস্ট থাকবে যদি গভর্নমেন্ট এনটিটিএনরা আরেকবার পুনর্বিবেচনা করেন যে ওনারা এই এক দেশ এক রেট এর মধ্যে আসতে পারেন কি না। তাহলে এটি পরিপূর্ণভাবে ‘এক দেশ এক রেট’ বাংলাদেশের জন্য, টেলিকম ইন্ডাস্ট্রির ইনফ্রাসট্র্যক্চারের জন্য একটি মাইলফলক শেষ হবে।’ এছাড়াও মোবাইল অপারেটরদের জন্যও ডেটার ট্যারিফ বেঁধে দিতে নিয়ন্ত্রণ কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
‘দেশ ও ইন্ডাস্ট্রির বৃহত্তর স্বার্থে এবং অভিভাকদের গাইডেন্সের বাধ্যবাধকতার কথা মাথায় রেখে ঘোষিত ট্যারিফে আমরা মেনে নিয়েছি। এটা আমাদের জন্য সাসটেইনেবল রিস্ক। এখন যদি কয়েক মাসের মধ্যে মোবাইল অপারেটরদের জন্য ট্যারিফ সেটিং করা হয় তবেই এনটিটিএন এর ট্যারিফ নির্ধারণ সম্পূর্ণ হবে।’
এদিকে মোবাইল অপারেটরদের বিরুদ্ধে ‘অসংখ্য অভিযোগ’ আসছে জানিয়ে এই ‘বিশৃঙ্খল অবস্থা’থেকে জনগণকে মুক্তি দিতে মোবাইল অপারেটরদের জন্য দ্রুত একটি ডাটা ট্যারিফ করতে বিটিআরসি-কে উদ্যোগ নিতে বলেছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার।
  ‘সবচেয়ে জটিল যে জায়গাটায় (ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট) যখন আমরা সমাধান তৈরি করতে পেরেছি; সুতরাং আমাদের পক্ষে মোবাইল অপারেটরদের ক্ষেত্রেও জটিলতা দূর করে ‘রেট নির্ধারণ’ ও ‘গুণগত মান’ নিয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে। ’  
মোবাইল অপারেটরদের পরিস্থিতি বুঝে সেবামূল্য ও মান ঠিক করার বার্তা দিয়ে মন্ত্রী বলেছেন, ‘মোবাইল অপারেটরদের বুঝতে হবে, তারা যখন জন্ম দিয়েছিলো তখন তাদের জন্য বড় বিষয় ছিলো যে তারা একজনের সঙ্গে আরেকজনের চলমান অবস্থায় কথা-বার্তা বলা যায় কিনা; সেই সেবাটা দিয়েই তারা ব্যবসায়-বাণিজ্য চালাতে পারবে। কিন্তু আজকের এই করোনার সময়ে তাদের রেভিনিউয়ের টোটাল চিত্রটা পাল্টে গেছে। যেখানে সর্বোচ্চ কল আসতো ভয়েস কল থেকে সেখানো কোনো কোনো অপারেটরের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত রেভিনিউ আসে ডেটাকল থেকে। এখন ভয়েস কলকে ডেটাকলে রিপ্লেস করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। ’ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেবা না দেয়াটা প্রতারণা উল্লেখ করে ‘সততার সঙ্গে জনগণের জন্য ব্যবসা’ করার আহ্বান জানিয়েছেন মন্ত্রী । এর আগে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার গ্রাহকের মোবাইলের অব্যবহৃত ডাটা ফেরত দেওয়ার যে নির্দেশ দিয়েছিলেন সে বিষয়ে কমিশন কাজ করছে জানিয়ে বিটিআরসি চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর সিকদার বলেছেন,
  ‘এখনো পর্যন্ত মোবাইল সেবার মান ভালো করতে পারেনি এটা সত্য। এ বিষয়ে দুটো কমিটি গঠন করা হয়েছে। দুটা কমিটিই কাজ করছে। আশা করছি আমরা শিগগিরই একটা ঘোষণা দিতে পারবো।’
  গ্রাহকের সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে বিটিআরসি কাজ করছে জানিয়ে বিটিআরসি প্রধান বলেছেন, ‘টিভ্যাস সেবা দিতে মোবাইল অপারেটরগুলো যে অনিয়ম করেছে সেটা আমরা ধরেছি এবং একটা জায়গায় নিয়ে আসতে পেরেছি। মোবাইল সেবার যত অনিয়ম সেগুলো আমরা পর্যবেক্ষণ করছি, মনিটরিং করছি। ইতোমধ্যেই বিটিআরসিতে নতুন নিয়োগ দেয়া হয়েছে। গতকাল (বুধবার) ৪৭ জনের নিয়োগ পত্রে স্বাক্ষর করেছি। তারা ২৩ অক্টোবর কাজে যোগ দেবে। আরেকটা বিষয় হলো এরইমধ্যে আমরা পিএমএস বা টেলিকম মনিটিরিং সার্ভিস সল্যুশন কিনেছি। কানাডার একটি কোম্পানি এটা স্থাপন করে দেবে। এটি যদি করতে পারি তাহলে আজকে যত কোয়ালিটি অব সার্ভিস ও অনিয়ম নিয়ে কথা আসছে সবগুলোই আমরা ভালো করে মনিটরিং করতে পারবো।’